শুক্রবার; 06 নভেম্বর 2026 আর্কাইভ
CampusLenzBD
শুক্রবার; 06 নভেম্বর 2026 | আর্কাইভ
সাফল্য

১৪১ দেশের প্রতিযোগীদের পেছনে ফেলে অক্সফোর্ডের পূর্ণ বৃত্তি পেলেন বাংলাদেশি নাজিফা

১৪১ দেশের প্রতিযোগীদের পেছনে ফেলে অক্সফোর্ডের পূর্ণ বৃত্তি পেলেন বাংলাদেশি নাজিফা
১৪১ দেশের প্রতিযোগীদের পেছনে ফেলে অক্সফোর্ডের পূর্ণ বৃত্তি পেলেন বাংলাদেশি নাজিফা

বিশ্বের অন্যতম মর্যাদাপূর্ণ উচ্চশিক্ষা প্রতিষ্ঠান যুক্তরাজ্যের অক্সফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়াশোনা করার স্বপ্ন দেখেন অসংখ্য শিক্ষার্থী। তবে সেখানে সম্পূর্ণ অর্থায়নে পড়ার সুযোগ পান তুলনামূলকভাবে অল্পসংখ্যক শিক্ষার্থী। এমনই একটি প্রতিযোগিতামূলক বৃত্তি অর্জন করেছেন বাংলাদেশের নাজিফা বিনতে হারুন।

নাজিফা বর্তমানে অক্সফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের ডিপার্টমেন্ট অব ইন্টারন্যাশনাল ডেভেলপমেন্টে উন্নয়ন অধ্যয়ন বিষয়ে এমফিল করছেন। তাঁর শিক্ষাব্যয় বহন করছে বিশ্ববিদ্যালয়ের ওডিআইডি ডিএসি স্কলারশিপ। আন্তর্জাতিক উন্নয়ন, সামাজিক বৈষম্য ও ন্যায়বিচার নিয়ে আগ্রহ, ভালো একাডেমিক ফলাফল এবং উন্নয়ন খাতে বাস্তব কাজের অভিজ্ঞতা তাঁর এই অর্জনের পেছনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছে।

আগ্রহ থেকে উন্নয়ন অধ্যয়নে যাত্রা

শৈশব থেকেই সমাজ, বৈষম্য এবং মানুষের অধিকার নিয়ে ভাবতে অভ্যস্ত ছিলেন নাজিফা। পরিবারে মুক্ত চিন্তা ও বিভিন্ন সামাজিক বিষয় নিয়ে আলোচনার পরিবেশ তাঁর দৃষ্টিভঙ্গি গঠনে ভূমিকা রাখে। সমাজে ক্ষমতার কাঠামো কীভাবে কাজ করে এবং সুবিধাবঞ্চিত মানুষের জীবনকে কীভাবে প্রভাবিত করে, এসব বিষয়ে ধীরে ধীরে আগ্রহী হয়ে ওঠেন তিনি।

শিক্ষাজীবনের শুরুতে বিজ্ঞান বিভাগে পড়লেও পরবর্তী সময়ে রাজনীতি, বিশ্বব্যবস্থা ও মানবসমাজের প্রতি আগ্রহ বাড়ে তাঁর। সেই আগ্রহ থেকেই বাংলাদেশের এশিয়ান ইউনিভার্সিটি ফর উইমেনে (এইউডব্লিউ) রাজনীতি, দর্শন ও অর্থনীতি বিষয়ে স্নাতক সম্পন্ন করেন। বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ার সময় ইতালির ইউনিভার্সিটি অব ত্রেন্তোতে এক সেমিস্টার অধ্যয়নের জন্য ইরাসমাস প্লাস আইসিএম বৃত্তিও অর্জন করেন।

ইতালিতে অধ্যয়নের অভিজ্ঞতা তাঁর চিন্তার জগৎকে আরও বিস্তৃত করে। সীমিত বাজেটে ইউরোপের ২১টি দেশ ভ্রমণের মাধ্যমে বিভিন্ন সমাজ, সংস্কৃতি ও মানুষের জীবনযাপনের সঙ্গে পরিচিত হন তিনি। নতুন পরিবেশে নিজেকে মানিয়ে নেওয়া এবং ভিন্ন বাস্তবতা বোঝার অভিজ্ঞতা তাঁর ব্যক্তিগত বিকাশের পাশাপাশি একাডেমিক আগ্রহকেও সমৃদ্ধ করে।

উন্নয়ন খাতে কাজের অভিজ্ঞতা

স্নাতক শেষ করার পর নাজিফা উন্নয়ন সংস্থা ব্র্যাকে কাজ করেন। পরবর্তী সময়ে মাই সোলি ফাউন্ডেশনের সঙ্গে যুক্ত হন। বাল্যবিবাহের ঝুঁকিতে থাকা কিশোরীদের নিয়ে কাজ করা একটি আন্তর্জাতিক বেসরকারি সংস্থার কার্যক্রমেও তাঁর অভিজ্ঞতা রয়েছে। এসব কাজের মাধ্যমে সামাজিক সমস্যা ও মানুষের বাস্তব জীবন কাছ থেকে বোঝার সুযোগ পান তিনি।

এর পাশাপাশি সামাজিক বিষয়ভিত্তিক প্রামাণ্যচিত্র ও স্বল্পদৈর্ঘ্য চলচ্চিত্র নির্মাণের সঙ্গেও যুক্ত ছিলেন নাজিফা। ফলে উন্নয়ন ও সামাজিক ন্যায়বিচার নিয়ে তাঁর আগ্রহ শুধু তাত্ত্বিক আলোচনায় সীমাবদ্ধ থাকেনি; বাস্তব অভিজ্ঞতার সঙ্গেও গভীরভাবে যুক্ত হয়েছে।

একাডেমিক ফলাফল ও নেতৃত্বের অভিজ্ঞতা

এইউডব্লিউ থেকে ৩.৯-এর বেশি সিজিপিএ নিয়ে স্নাতক সম্পন্ন করেন নাজিফা এবং সুমা কাম লডে সম্মান অর্জন করেন। উন্নয়ন অধ্যয়নের সঙ্গে সম্পর্কিত কোর্স ও বিষয়গুলোকে নিজের একাডেমিক প্রস্তুতির অংশ হিসেবে গুরুত্ব দিয়ে উপস্থাপন করেন তিনি।

তবে পুরো শিক্ষাজীবনে তাঁর ফলাফল সব সময় একই রকম ছিল না। কয়েকটি সেমিস্টারে ফলাফল প্রত্যাশা অনুযায়ী না হওয়ায় কিছু কোর্স পুনরায় সম্পন্ন করেন। পরবর্তী সময়ে ফলাফলের উন্নতির মাধ্যমে নিজের একাডেমিক সক্ষমতা আরও দৃঢ় করেন। এই অভিজ্ঞতা দেখায়, সাময়িক বাধার পরও ধারাবাহিক প্রচেষ্টা ও উন্নতির মানসিকতা গুরুত্বপূর্ণ।

বিশ্ববিদ্যালয়ে থাকাকালে দুটি গুরুত্বপূর্ণ ক্লাবে নেতৃত্ব দিয়েছেন নাজিফা। প্রথম বর্ষেই একটি একাডেমিক দলের নেতৃত্ব দেওয়ার পাশাপাশি সহপাঠীদের পড়াশোনায় সহায়তা করতে পিয়ার টিউটর হিসেবেও কাজ করেন। এসব অভিজ্ঞতা তাঁর নেতৃত্ব, সাংগঠনিক দক্ষতা এবং দলগতভাবে কাজ করার সক্ষমতা তুলে ধরে।

উদ্দেশ্যপত্রে গুরুত্ব পেয়েছে নির্দিষ্ট লক্ষ্য

অক্সফোর্ডে আবেদনের ক্ষেত্রে স্টেটমেন্ট অব পারপাস বা উদ্দেশ্যপত্র তৈরিকে সবচেয়ে চ্যালেঞ্জিং ধাপগুলোর একটি হিসেবে দেখেন নাজিফা। নিজের জীবনের সব অভিজ্ঞতা একসঙ্গে তুলে ধরার পরিবর্তে কেন উন্নয়ন অধ্যয়ন করতে চান, কোন প্রশ্নের উত্তর খুঁজছেন এবং অক্সফোর্ডের নির্দিষ্ট প্রোগ্রামটি কীভাবে সেই লক্ষ্য অর্জনে সহায়তা করবে—এসব বিষয় স্পষ্টভাবে ব্যাখ্যা করেন তিনি।

নিজের একাডেমিক আগ্রহ, পূর্ববর্তী অভিজ্ঞতা ও ভবিষ্যৎ পরিকল্পনাকে একটি সুসংগত ধারায় সাজান নাজিফা। গবেষণার আগ্রহের সঙ্গে প্রাসঙ্গিক কোর্সের সম্পর্ক তুলে ধরার পাশাপাশি বিশ্ববিদ্যালয়ের একাডেমিক পরিবেশে নিজের অভিজ্ঞতা ও দৃষ্টিভঙ্গির মাধ্যমে কী অবদান রাখতে পারবেন, সেটিও ব্যাখ্যা করেন।

তাঁর অভিজ্ঞতায়, আবেদনপত্রে অতিরঞ্জিত ভাষা ব্যবহারের চেয়ে সুনির্দিষ্ট তথ্য ও স্পষ্ট উদ্দেশ্য বেশি গুরুত্বপূর্ণ। যে বিশ্ববিদ্যালয় ও প্রোগ্রামে আবেদন করা হচ্ছে, তার পাঠ্যক্রম, গবেষণার সুযোগ এবং নিজের লক্ষ্য সম্পর্কে ভালো ধারণা থাকা প্রয়োজন।

সুপারিশপত্রের প্রস্তুতিও ছিল পরিকল্পিত

আবেদনের জন্য সুপারিশপত্র প্রস্তুত করতেও আগেভাগে পরিকল্পনা করেন নাজিফা। স্নাতক পর্যায় থেকেই শিক্ষকদের সঙ্গে নিজের একাডেমিক আগ্রহ ও ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা নিয়ে আলোচনা করতেন তিনি। আবেদনের সময়সীমার প্রায় চার মাস আগে সম্ভাব্য সুপারিশকারীদের সঙ্গে যোগাযোগ করেন। তাঁদের সঙ্গে জীবনবৃত্তান্ত, আবেদন করা প্রোগ্রামের তথ্য এবং নিজের উল্লেখযোগ্য কাজ ও অর্জনের বিবরণ ভাগ করে নেন।

এতে শিক্ষকেরা তাঁর একাডেমিক সক্ষমতা, কাজের ধরন ও ভবিষ্যৎ সম্ভাবনা সম্পর্কে প্রাসঙ্গিক তথ্যের ভিত্তিতে সুপারিশপত্র প্রস্তুত করার সুযোগ পান। তাঁর অভিজ্ঞতা থেকে বোঝা যায়, আন্তর্জাতিক উচ্চশিক্ষার আবেদনে সুপারিশপত্রের প্রস্তুতি শেষ মুহূর্তে না রেখে দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনার অংশ হিসেবে নেওয়া উপকারী।

বাংলাদেশি শিক্ষার্থীদের জন্য পরামর্শ

নাজিফার মতে, আন্তর্জাতিক বিশ্ববিদ্যালয়ে আবেদনের আগেই নিজের যোগ্যতা নিয়ে নিরুৎসাহিত হওয়া উচিত নয়। নিজ দেশের সামাজিক বাস্তবতা, ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতা ও ভিন্ন সাংস্কৃতিক পরিবেশে বেড়ে ওঠার অভিজ্ঞতাও আন্তর্জাতিক শিক্ষাঙ্গনে মূল্যবান দৃষ্টিভঙ্গি যোগ করতে পারে। প্রয়োজন হলো, সেসব অভিজ্ঞতাকে নিজের একাডেমিক আগ্রহ ও ভবিষ্যৎ পরিকল্পনার সঙ্গে যথাযথভাবে যুক্ত করে তুলে ধরা।

তিনি একই সঙ্গে শিক্ষার্থীদের একাধিক বৃত্তির সুযোগ খোঁজার পরামর্শ দেন। বিশ্ববিদ্যালয়, বিভাগ, কলেজ এবং বাইরের বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের অর্থায়ন কর্মসূচি সম্পর্কে আগে থেকেই তথ্য সংগ্রহ করা উচিত। পাশাপাশি প্রতিটি বৃত্তির যোগ্যতা, আবেদনপ্রক্রিয়া ও সময়সীমা আলাদাভাবে যাচাই করা জরুরি।

নাজিফা বিনতে হারুনের অক্সফোর্ডযাত্রা উচ্চশিক্ষায় আগ্রহী বাংলাদেশি শিক্ষার্থীদের জন্য অনুপ্রেরণার একটি উদাহরণ। তাঁর অভিজ্ঞতা তুলে ধরে যে ভালো ফলাফলের পাশাপাশি সুস্পষ্ট লক্ষ্য, বাস্তব কাজের অভিজ্ঞতা, পরিকল্পিত আবেদন এবং নিজের আগ্রহকে যথাযথভাবে উপস্থাপনের দক্ষতাও আন্তর্জাতিক পর্যায়ে উচ্চশিক্ষার সুযোগ অর্জনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে।

সম্পর্কিত খবর

বাংলাদেশের প্রথম হিন্দু নারী বিচারপতি কৃষ্ণা দেবনাথের অনুপ্রেরণার গল্প success

বাংলাদেশের প্রথম হিন্দু নারী বিচারপতি কৃষ্ণা দেবনাথের অনুপ্রেরণার গল্প

প্রতিবেদক: নিজস্ব প্রতিবেদক

শৈশবে বাবার আদালতে বিচার কার্যক্রম দেখে বিচারক হওয়ার স্বপ্ন দেখেছিলেন কৃষ্ণা দেবনাথ। রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের আইন বিভাগ থেকে পড়াশোনা শেষ করে মাত্র ২৬ বছর বয়সে বিচার বিভাগে যোগ দেন তিনি। দীর্ঘ কর্মজীবনে নানা প্রতিকূলতা পেরিয়ে ২০২২ সালে দেশের সর্বোচ্চ আদালত সুপ্রিম কোর্টের আপিল বিভাগের বিচারপতি হন তিনি। বাংলাদেশের প্রথম হিন্দু নারী বিচারক হিসেবে পরিচিত কৃষ্ণা দেবনাথের জীবনপথ বিচারাঙ্গনে নারীর অগ্রযাত্রার এক উল্লেখযোগ্য দৃষ্টান্ত।

জাবির সাবেক শিক্ষার্থী ওয়ালিদ ইসলাম, দেশের প্রথম তৃতীয় লিঙ্গের বিসিএস ক্যাডার success

জাবির সাবেক শিক্ষার্থী ওয়ালিদ ইসলাম, দেশের প্রথম তৃতীয় লিঙ্গের বিসিএস ক্যাডার

প্রতিবেদক: নিজস্ব প্রতিবেদক

জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের ফার্মেসি বিভাগের সাবেক শিক্ষার্থী ওয়ালিদ ইসলাম দেশের প্রথম তৃতীয় লিঙ্গের বিসিএস ক্যাডার কর্মকর্তা হিসেবে পরিচিত। ৩৫তম বিসিএসের মাধ্যমে পররাষ্ট্র ক্যাডারে যোগ দিয়ে চীন, জাপান, মালয়েশিয়া ও ভারতে কূটনৈতিক দায়িত্ব পালন করেছেন তিনি। বর্তমানে বাংলাদেশ দূতাবাস, তেহরানে ফার্স্ট সেক্রেটারি হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন।

টেসলার রোডস্টারের নকশায় কাজ করেছেন বুয়েটের তারেক সরোয়ার! success

টেসলার রোডস্টারের নকশায় কাজ করেছেন বুয়েটের তারেক সরোয়ার!

প্রতিবেদক: সংগৃহীত

বিশ্বখ্যাত বৈদ্যুতিক গাড়ি নির্মাতা প্রতিষ্ঠান টেসলার রোডস্টারের নতুন মডেলের গুরুত্বপূর্ণ প্রকৌশল প্রকল্পে কাজ করেছেন বাংলাদেশি প্রকৌশলী তারেক সরোয়ার। ২০২৩ সালে ইন্টার্নশিপ চলাকালে গাড়িটির আন্ডারবডির দীর্ঘমেয়াদি কার্যকারিতা বিশ্লেষণের দায়িত্বে ছিলেন তিনি। তাঁর বিশ্লেষণ থেকে পাওয়া ফলাফল পরবর্তী সময়ে যন্ত্রাংশটির চূড়ান্ত নকশা তৈরিতে ব্যবহৃত হয়।

টিনের ঘর থেকে বিসিএসে পররাষ্ট্র ক্যাডারে প্রথম তানভীর রহমান success

টিনের ঘর থেকে বিসিএসে পররাষ্ট্র ক্যাডারে প্রথম তানভীর রহমান

প্রতিবেদক: সংগৃহীত

নেত্রকোনার ছোট্ট টিনের ঘরে কেরোসিনের কুপি ও মোমবাতির আলোয় পড়াশোনা করে বড় হয়েছেন তানভীর রহমান। সীমিত সুযোগ-সুবিধার মধ্যেও অধ্যবসায় ও নিয়মিত পরিশ্রমের মাধ্যমে জীবনের প্রথম বিসিএসেই বড় সাফল্য অর্জন করেছেন তিনি। ৪৭তম বিসিএসের চূড়ান্ত ফলে পররাষ্ট্র ক্যাডারে প্রথম স্থান অর্জন করেছেন এই তরুণ।