শুক্রবার; 06 নভেম্বর 2026 আর্কাইভ
CampusLenzBD
শুক্রবার; 06 নভেম্বর 2026 | আর্কাইভ
সাফল্য

বাংলাদেশের প্রথম হিন্দু নারী বিচারপতি কৃষ্ণা দেবনাথের অনুপ্রেরণার গল্প

বাংলাদেশের প্রথম হিন্দু নারী বিচারপতি কৃষ্ণা দেবনাথের অনুপ্রেরণার গল্প
বাংলাদেশের প্রথম হিন্দু নারী বিচারপতি কৃষ্ণা দেবনাথ

শৈশবে বাবার আদালতে বসে বিচার কার্যক্রম দেখতেন কৃষ্ণা দেবনাথ। সেখান থেকেই বিচারক হওয়ার স্বপ্ন বুনতে শুরু করেন তিনি। সেই স্বপ্ন পূরণে রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ে আইন বিষয়ে পড়াশোনা করেন। মাত্র ২৬ বছর বয়সে বিচার বিভাগে কর্মজীবন শুরু করে দীর্ঘ চার দশকের পথ পেরিয়ে পৌঁছান দেশের সর্বোচ্চ আদালত সুপ্রিম কোর্টের আপিল বিভাগে। বাংলাদেশের প্রথম হিন্দু নারী বিচারক হিসেবে পরিচিত কৃষ্ণা দেবনাথের এই অর্জন বিচারাঙ্গনে নারীর অগ্রযাত্রার একটি উল্লেখযোগ্য দৃষ্টান্ত।

১৯৫৫ সালের ১০ অক্টোবর রাজবাড়ীতে জন্মগ্রহণ করেন কৃষ্ণা দেবনাথ। তাঁর বাবা দীনেশ চন্দ্র দেবনাথ বিচার বিভাগের কর্মকর্তা ছিলেন। বাবার বদলিজনিত চাকরির কারণে শৈশবে দেশের বিভিন্ন জেলায় বসবাস করতে হয়েছে তাঁকে। বাবার কর্মস্থলের আদালতে নিয়মিত বিচার কার্যক্রম দেখার সুযোগ থেকেই বিচারক হওয়ার আগ্রহ তৈরি হয় তাঁর মধ্যে।

১৯৭০ সালে সিলেট গার্লস স্কুল থেকে বিজ্ঞান বিভাগে ম্যাট্রিকুলেশন পাস করেন কৃষ্ণা দেবনাথ। পরে বিচারক হওয়ার লক্ষ্য সামনে রেখে মানবিক বিভাগে উচ্চমাধ্যমিক পড়াশোনা করেন। রংপুরের বেগম রোকেয়া কলেজ থেকে উচ্চমাধ্যমিক শেষ করে রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের আইন বিভাগে ভর্তি হন। সেখান থেকে বি.জুর ও এম.জুর ডিগ্রি অর্জনের পর রাজশাহী জেলা আইন সমিতির মাধ্যমে আইন পেশায় যুক্ত হন।

আইনজীবী হিসেবে প্রায় এক বছর কাজ করার পর ১৯৮১ সালের ৮ ডিসেম্বর জুডিশিয়াল সার্ভিসে মুনসেফ পদে নিয়োগ পান তিনি, যা বর্তমানে সহকারী জজ পদ হিসেবে পরিচিত। তখন তাঁর বয়স ছিল মাত্র ২৬ বছর। এভাবেই শুরু হয় তাঁর দীর্ঘ বিচারিক কর্মজীবন।

তবে কর্মজীবনের শুরু থেকে সব পথ মসৃণ ছিল না। ১৯৯২ সালে সাবজজ থেকে অতিরিক্ত জেলা জজ পদে পদোন্নতির ক্ষেত্রে বাধার মুখে পড়েন তিনি। সুপ্রিম কোর্টের ফুল কোর্ট সভায় পরপর তিনবার পদোন্নতির সুপারিশ করা হলেও তা কার্যকর হয়নি বলে জানা যায়। এ পরিস্থিতিতে একসময় চাকরি ছেড়ে দেওয়ার কথাও ভেবেছিলেন কৃষ্ণা দেবনাথ। তাঁর এক স্বজনের ভাষ্য অনুযায়ী, হতাশার সময়ে তিনি সঙ্গে পদত্যাগপত্রও রাখতেন।

এমন কঠিন সময়ে পরিবার ও দেশের জ্যেষ্ঠ আইনজীবীদের সহযোগিতা পেয়েছেন তিনি। পরবর্তী সময়ে ১৯৯৪ সালে অতিরিক্ত জেলা জজ এবং ১৯৯৮ সালে জেলা জজ হিসেবে পদোন্নতি লাভ করেন। প্রতিকূলতা অতিক্রম করে নিজের কর্মজীবন এগিয়ে নেওয়ার ক্ষেত্রে ধৈর্য ও পেশাগত নিষ্ঠা গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে।

কৃষ্ণা দেবনাথের ব্যক্তিগত জীবনেও পরিবারের সহযোগিতা ছিল উল্লেখযোগ্য। ১৯৮১ সালে রবীন্দ্রসংগীতশিল্পী স্বপন দত্তের সঙ্গে বিবাহবন্ধনে আবদ্ধ হন তিনি। বিচারিক দায়িত্বের কারণে বিভিন্ন জেলায় বদলি হতে হয়েছে তাঁকে। এ সময়ে দুই কন্যার পড়াশোনা ও দেখাশোনার বড় দায়িত্ব সামলেছেন তাঁর স্বামী এবং পরিবারের অন্য সদস্যরা। তাঁর দুই মেয়ে ড. আনন্দী কল্যাণ ও ড. ইন্দিরা কল্যাণ পরবর্তী সময়ে যুক্তরাষ্ট্রের পৃথক বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষকতা শুরু করেন।

বিভিন্ন জেলায় জেলা জজ হিসেবে দায়িত্ব পালনের পর ২০১০ সালের ১০ জানুয়ারি ঢাকার জেলা জজ হিসেবে যোগ দেন কৃষ্ণা দেবনাথ। তিনি ঢাকা জেলার প্রথম নারী জেলা জজ হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। একই বছরের ১৮ এপ্রিল হাইকোর্ট বিভাগের অতিরিক্ত বিচারপতি হিসেবে নিয়োগ পান। পরবর্তী সময়ে ২০১২ সালের ১৫ এপ্রিল তাঁর নিয়োগ স্থায়ী হয়।

বিচারিক জীবনের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায় আসে ২০২২ সালের ৯ জানুয়ারি। ওই দিন সুপ্রিম কোর্টের আপিল বিভাগের বিচারপতি হিসেবে শপথ নেন কৃষ্ণা দেবনাথ। এর মধ্য দিয়ে তিনি আপিল বিভাগের তৃতীয় নারী বিচারপতি হিসেবে দায়িত্ব গ্রহণ করেন। দেশের বিচার বিভাগে নারীদের অংশগ্রহণ ও অগ্রযাত্রায় তাঁর এই নিয়োগ বিশেষ গুরুত্ব বহন করে।

পেশাগত দায়িত্ব পালনের পাশাপাশি ধৈর্য, সততা ও নিষ্ঠাকে জীবনের সাফল্যের মূল ভিত্তি হিসেবে দেখেছেন কৃষ্ণা দেবনাথ। প্রতিকূল পরিস্থিতিতেও দায়িত্ব থেকে পিছিয়ে না আসার অভিজ্ঞতা তিনি জুনিয়র বিচারকদের সঙ্গে ভাগ করে নিতেন। তাঁর মতে, ধৈর্য ধরে সততা ও নিষ্ঠার সঙ্গে কাজ করে গেলে কাঙ্ক্ষিত লক্ষ্যে পৌঁছানো সম্ভব।

বাবার আদালতে বসে বিচারক হওয়ার যে স্বপ্নের সূচনা হয়েছিল, দীর্ঘ কর্মজীবনের অভিজ্ঞতা ও অধ্যবসায়ের মধ্য দিয়ে সেই স্বপ্ন পূরণ করেন কৃষ্ণা দেবনাথ। রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের আইন বিভাগের শিক্ষার্থী থেকে দেশের সর্বোচ্চ আদালতের বিচারপতি হয়ে ওঠার তাঁর এই যাত্রা বাংলাদেশের বিচারাঙ্গনে নারীর অগ্রগতির ইতিহাসে স্মরণীয় হয়ে থাকবে।

সম্পর্কিত খবর

জাবির সাবেক শিক্ষার্থী ওয়ালিদ ইসলাম, দেশের প্রথম তৃতীয় লিঙ্গের বিসিএস ক্যাডার success

জাবির সাবেক শিক্ষার্থী ওয়ালিদ ইসলাম, দেশের প্রথম তৃতীয় লিঙ্গের বিসিএস ক্যাডার

প্রতিবেদক: নিজস্ব প্রতিবেদক

জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের ফার্মেসি বিভাগের সাবেক শিক্ষার্থী ওয়ালিদ ইসলাম দেশের প্রথম তৃতীয় লিঙ্গের বিসিএস ক্যাডার কর্মকর্তা হিসেবে পরিচিত। ৩৫তম বিসিএসের মাধ্যমে পররাষ্ট্র ক্যাডারে যোগ দিয়ে চীন, জাপান, মালয়েশিয়া ও ভারতে কূটনৈতিক দায়িত্ব পালন করেছেন তিনি। বর্তমানে বাংলাদেশ দূতাবাস, তেহরানে ফার্স্ট সেক্রেটারি হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন।

টেসলার রোডস্টারের নকশায় কাজ করেছেন বুয়েটের তারেক সরোয়ার! success

টেসলার রোডস্টারের নকশায় কাজ করেছেন বুয়েটের তারেক সরোয়ার!

প্রতিবেদক: সংগৃহীত

বিশ্বখ্যাত বৈদ্যুতিক গাড়ি নির্মাতা প্রতিষ্ঠান টেসলার রোডস্টারের নতুন মডেলের গুরুত্বপূর্ণ প্রকৌশল প্রকল্পে কাজ করেছেন বাংলাদেশি প্রকৌশলী তারেক সরোয়ার। ২০২৩ সালে ইন্টার্নশিপ চলাকালে গাড়িটির আন্ডারবডির দীর্ঘমেয়াদি কার্যকারিতা বিশ্লেষণের দায়িত্বে ছিলেন তিনি। তাঁর বিশ্লেষণ থেকে পাওয়া ফলাফল পরবর্তী সময়ে যন্ত্রাংশটির চূড়ান্ত নকশা তৈরিতে ব্যবহৃত হয়।

১৪১ দেশের প্রতিযোগীদের পেছনে ফেলে অক্সফোর্ডের পূর্ণ বৃত্তি পেলেন বাংলাদেশি নাজিফা success

১৪১ দেশের প্রতিযোগীদের পেছনে ফেলে অক্সফোর্ডের পূর্ণ বৃত্তি পেলেন বাংলাদেশি নাজিফা

প্রতিবেদক: সংগৃহীত

যুক্তরাজ্যের অক্সফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয়ে উন্নয়ন অধ্যয়নে এমফিল করছেন বাংলাদেশের নাজিফা বিনতে হারুন। ওডিআইডি ডিএসি স্কলারশিপের আওতায় তাঁর পড়াশোনার সম্পূর্ণ ব্যয় বহন করা হচ্ছে। একাডেমিক সাফল্য, উন্নয়ন খাতে কাজের অভিজ্ঞতা ও সুস্পষ্ট লক্ষ্যকে আবেদনে তুলে ধরে অর্জন করেছেন এই মর্যাদাপূর্ণ বৃত্তি।

টিনের ঘর থেকে বিসিএসে পররাষ্ট্র ক্যাডারে প্রথম তানভীর রহমান success

টিনের ঘর থেকে বিসিএসে পররাষ্ট্র ক্যাডারে প্রথম তানভীর রহমান

প্রতিবেদক: সংগৃহীত

নেত্রকোনার ছোট্ট টিনের ঘরে কেরোসিনের কুপি ও মোমবাতির আলোয় পড়াশোনা করে বড় হয়েছেন তানভীর রহমান। সীমিত সুযোগ-সুবিধার মধ্যেও অধ্যবসায় ও নিয়মিত পরিশ্রমের মাধ্যমে জীবনের প্রথম বিসিএসেই বড় সাফল্য অর্জন করেছেন তিনি। ৪৭তম বিসিএসের চূড়ান্ত ফলে পররাষ্ট্র ক্যাডারে প্রথম স্থান অর্জন করেছেন এই তরুণ।