জাবির সাবেক শিক্ষার্থী ওয়ালিদ ইসলাম, দেশের প্রথম তৃতীয় লিঙ্গের বিসিএস ক্যাডার
জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের (জাবি) ফার্মেসি বিভাগের সাবেক শিক্ষার্থী ওয়ালিদ ইসলাম দেশের প্রথম তৃতীয় লিঙ্গের বিসিএস ক্যাডার কর্মকর্তা হিসেবে পরিচিত। ৩৫তম বিসিএসের মাধ্যমে পররাষ্ট্র ক্যাডারে যোগ দিয়ে চীন, জাপান, মালয়েশিয়া ও ভারতে কূটনৈতিক দায়িত্ব পালন করেছেন তিনি। বর্তমানে বাংলাদেশ দূতাবাস, তেহরানে ফার্স্ট সেক্রেটারি হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন।
কূটনৈতিক দায়িত্ব পালনের অংশ হিসেবে তিনি চীন, জাপান, মালয়েশিয়া ও ভারতে কাজ করেছেন। পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে আট বছরের বেশি সময় ধরে দায়িত্ব পালন করা ওয়ালিদের কর্মজীবন দেশের গণ্ডি পেরিয়ে আন্তর্জাতিক পরিসরেও বিস্তৃত হয়েছে।
২০২৪ সালের ১০ জানুয়ারি, ৩৪ বছর বয়সে নিজের ফেসবুক পোস্টের মাধ্যমে প্রথমবারের মতো প্রকাশ্যে হিজড়া পরিচয় তুলে ধরেন ওয়ালিদ। দীর্ঘদিন নিজের পরিচয় আড়াল করে রাখার পর তিনি সেই অবস্থান থেকে বেরিয়ে আসার সিদ্ধান্ত নেন। মানুষের কৌতূহলী প্রশ্ন, কটূক্তি এবং চলাফেরা ও কথা বলার ধরন নিয়ে বিদ্রূপ তাঁকে দীর্ঘদিন অস্বস্তিতে রেখেছিল। পরিচয় প্রকাশের পর সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে তাঁকে ঘিরে আলোচনা তৈরি হয়। অনেকেই তাঁর সাহসের প্রশংসা করেন, আবার কিছু মানুষ বিদ্রূপও করেন।
ওয়ালিদের জন্ম গোপালগঞ্জে এবং বেড়ে ওঠা যশোরে। আট ভাইবোনের পরিবারে তাঁর বাবা পেশায় ট্রাকচালক ছিলেন। ওয়ালিদের বয়স যখন ১০ থেকে ১১ বছর, তখন তিনি বাবাকে হারান। এরপর মা আমিনা বেগম এবং বড় ও সেজ ভাইয়ের সহযোগিতায় এগিয়ে চলে তাঁর শিক্ষাজীবন। আর্থিক সীমাবদ্ধতা থাকা সত্ত্বেও পরিবার তাঁর পড়াশোনা ও বেড়ে ওঠার ক্ষেত্রে সর্বোচ্চ সহযোগিতা করেছে।
শৈশব থেকেই মেধাবী শিক্ষার্থী হিসেবে পরিচিত ছিলেন ওয়ালিদ। ইংরেজি ভাষায় দক্ষতা অর্জনের পাশাপাশি সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ডেও তাঁর আগ্রহ ছিল। তবে লিঙ্গগত বৈচিত্র্যের কারণে ছোটবেলায় তাঁকে নানা সামাজিক পরিস্থিতির মুখোমুখি হতে হয়েছে। এমন সময়েও পরিবারের সদস্যরা তাঁকে আগলে রেখেছেন এবং নিজের মতো করে জীবন গড়ার সুযোগ দিয়েছেন।
উচ্চশিক্ষার জন্য তিনি ভর্তি হন জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের ফার্মেসি বিভাগে। বিশ্ববিদ্যালয়ের পড়াশোনা শেষ করে বিসিএস পরীক্ষায় অংশ নেন। প্রথমবার নন-ক্যাডার পদে চাকরি পেলেও লক্ষ্য থেকে সরে যাননি। পরবর্তী সময়ে ৩৫তম বিসিএসের মাধ্যমে পররাষ্ট্র ক্যাডারে যোগ দিয়ে কূটনৈতিক পেশায় নিজের কর্মজীবন শুরু করেন।
ওয়ালিদের শিক্ষাগত সনদ ও চাকরিসংক্রান্ত নথিতে এত দিন পুরুষ পরিচয় ব্যবহৃত হয়েছে। তিনি যখন বিসিএস পরীক্ষায় অংশ নেন, তখন আবেদনপত্রে নারী ও পুরুষের বাইরে অন্যান্য লিঙ্গপরিচয় উল্লেখের সুযোগ ছিল না। অন্যদিকে, বাংলাদেশ সরকার ২০১৪ সালে গেজেট প্রকাশের মাধ্যমে হিজড়া জনগোষ্ঠীর লিঙ্গপরিচয়কে রাষ্ট্রীয় স্বীকৃতি দেয়।
ব্যক্তিগত জীবনেও নানা অভিজ্ঞতার মধ্য দিয়ে যেতে হয়েছে তাঁকে। একসময় একজনের সঙ্গে তাঁর সম্পর্ক বিয়ের সিদ্ধান্ত পর্যন্ত গড়িয়েছিল। সেই সম্পর্কের প্রেক্ষাপটে অস্ত্রোপচারের মাধ্যমে নারী হওয়ার পরিকল্পনাও করেছিলেন তিনি। তবে শেষ পর্যন্ত বিয়ে হয়নি এবং পরিকল্পিত কিছু অস্ত্রোপচারও আর করাননি। নিজের শিক্ষাগত সনদেও কোনো পরিবর্তন আনেননি।
পেশাগত জীবনের পাশাপাশি শিল্প-সাহিত্য ও সৃজনশীল কাজের প্রতিও ওয়ালিদের রয়েছে গভীর আগ্রহ। আনুষ্ঠানিক প্রশিক্ষণ ছাড়াই ছবি আঁকা, গান লেখা ও গান গাওয়ার চর্চা করেন তিনি। নিজের হাতে তৈরি বিভিন্ন শিল্পকর্ম ও ব্যবহার্য সামগ্রী দিয়ে তেহরানের বাসা সাজিয়েছেন। সেখানে বাংলাদেশের শিকা, কাঁথা সেলাইয়ের হস্তশিল্পসহ বিভিন্ন দেশের ঐতিহ্যবাহী সামগ্রী স্থান পেয়েছে। তাঁর শিল্পকর্মে বাংলাদেশের সংস্কৃতি ও ঐতিহ্যের প্রতিফলন দেখা যায়।
ওয়ালিদের এই পথচলা কেবল একজন বিসিএস কর্মকর্তার পেশাগত সাফল্যের গল্প নয়; এটি সামাজিক প্রতিবন্ধকতা অতিক্রম করে নিজের পরিচয় ও যোগ্যতা প্রতিষ্ঠারও একটি দৃষ্টান্ত। জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী থেকে পররাষ্ট্র ক্যাডারের কর্মকর্তা হয়ে বিভিন্ন দেশে বাংলাদেশের প্রতিনিধিত্ব—প্রতিটি ধাপেই তাঁর অধ্যবসায় ও পরিবারের সহযোগিতার ভূমিকা রয়েছে। তাঁর অর্জন লিঙ্গবৈচিত্র্যের মানুষের শিক্ষা, কর্মসংস্থান ও পেশাগত অগ্রগতির সম্ভাবনাকে নতুন করে সামনে এনেছে।
সম্পর্কিত খবর
success
বাংলাদেশের প্রথম হিন্দু নারী বিচারপতি কৃষ্ণা দেবনাথের অনুপ্রেরণার গল্প
প্রতিবেদক: নিজস্ব প্রতিবেদকশৈশবে বাবার আদালতে বিচার কার্যক্রম দেখে বিচারক হওয়ার স্বপ্ন দেখেছিলেন কৃষ্ণা দেবনাথ। রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের আইন বিভাগ থেকে পড়াশোনা শেষ করে মাত্র ২৬ বছর বয়সে বিচার বিভাগে যোগ দেন তিনি। দীর্ঘ কর্মজীবনে নানা প্রতিকূলতা পেরিয়ে ২০২২ সালে দেশের সর্বোচ্চ আদালত সুপ্রিম কোর্টের আপিল বিভাগের বিচারপতি হন তিনি। বাংলাদেশের প্রথম হিন্দু নারী বিচারক হিসেবে পরিচিত কৃষ্ণা দেবনাথের জীবনপথ বিচারাঙ্গনে নারীর অগ্রযাত্রার এক উল্লেখযোগ্য দৃষ্টান্ত।
success
টেসলার রোডস্টারের নকশায় কাজ করেছেন বুয়েটের তারেক সরোয়ার!
প্রতিবেদক: সংগৃহীতবিশ্বখ্যাত বৈদ্যুতিক গাড়ি নির্মাতা প্রতিষ্ঠান টেসলার রোডস্টারের নতুন মডেলের গুরুত্বপূর্ণ প্রকৌশল প্রকল্পে কাজ করেছেন বাংলাদেশি প্রকৌশলী তারেক সরোয়ার। ২০২৩ সালে ইন্টার্নশিপ চলাকালে গাড়িটির আন্ডারবডির দীর্ঘমেয়াদি কার্যকারিতা বিশ্লেষণের দায়িত্বে ছিলেন তিনি। তাঁর বিশ্লেষণ থেকে পাওয়া ফলাফল পরবর্তী সময়ে যন্ত্রাংশটির চূড়ান্ত নকশা তৈরিতে ব্যবহৃত হয়।
success
১৪১ দেশের প্রতিযোগীদের পেছনে ফেলে অক্সফোর্ডের পূর্ণ বৃত্তি পেলেন বাংলাদেশি নাজিফা
প্রতিবেদক: সংগৃহীতযুক্তরাজ্যের অক্সফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয়ে উন্নয়ন অধ্যয়নে এমফিল করছেন বাংলাদেশের নাজিফা বিনতে হারুন। ওডিআইডি ডিএসি স্কলারশিপের আওতায় তাঁর পড়াশোনার সম্পূর্ণ ব্যয় বহন করা হচ্ছে। একাডেমিক সাফল্য, উন্নয়ন খাতে কাজের অভিজ্ঞতা ও সুস্পষ্ট লক্ষ্যকে আবেদনে তুলে ধরে অর্জন করেছেন এই মর্যাদাপূর্ণ বৃত্তি।
success
টিনের ঘর থেকে বিসিএসে পররাষ্ট্র ক্যাডারে প্রথম তানভীর রহমান
প্রতিবেদক: সংগৃহীতনেত্রকোনার ছোট্ট টিনের ঘরে কেরোসিনের কুপি ও মোমবাতির আলোয় পড়াশোনা করে বড় হয়েছেন তানভীর রহমান। সীমিত সুযোগ-সুবিধার মধ্যেও অধ্যবসায় ও নিয়মিত পরিশ্রমের মাধ্যমে জীবনের প্রথম বিসিএসেই বড় সাফল্য অর্জন করেছেন তিনি। ৪৭তম বিসিএসের চূড়ান্ত ফলে পররাষ্ট্র ক্যাডারে প্রথম স্থান অর্জন করেছেন এই তরুণ।