শতবর্ষের গৌরবময় ইতিহাস, প্রাচীন দলিলপত্র ও ঐতিহ্য থাকা সত্ত্বেও শতবর্ষী শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের তালিকায় স্থান হয়নি নেত্রকোনার আটপাড়া উপজেলার তেলিগাতী বৈদ্যনাথ হরেকৃষ্ণ একাডেমীর। ১৯০৫ সালে প্রতিষ্ঠিত এই শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানটি তালিকায় অন্তর্ভুক্ত না হওয়ায় হতাশ হয়ে পড়েছেন বিদ্যালয়ের শিক্ষক-শিক্ষার্থী, কর্মচারী ও স্থানীয় বাসিন্দারা। তাদের দাবি, প্রয়োজনীয় তথ্য-প্রমাণ যাচাই করে বিদ্যালয়টিকে শতবর্ষী শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের তালিকায় অন্তর্ভুক্ত করা হোক।
সম্প্রতি শতবর্ষী আট শতাধিক শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের তালিকা শিক্ষা মন্ত্রণালয়ে পাঠিয়েছে মাধ্যমিক ও উচ্চশিক্ষা অধিদপ্তর (মাউশি)। তবে ওই তালিকায় তেলিগাতী বৈদ্যনাথ হরেকৃষ্ণ একাডেমীর নাম না থাকায় বিদ্যালয়টির দীর্ঘদিনের ঐতিহ্য ও ইতিহাস যথাযথ স্বীকৃতি থেকে বঞ্চিত হচ্ছে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা।
বিদ্যালয় কর্তৃপক্ষের দাবি, বিভিন্ন ঐতিহাসিক দলিল, প্রাচীন সরকারি প্রকাশনা ও নির্ভরযোগ্য তথ্যসূত্রে প্রতিষ্ঠানটির প্রতিষ্ঠাকাল ১৯০৫ সাল হিসেবে উল্লেখ রয়েছে। বাংলাপিডিয়া (বাংলাদেশ জাতীয় জ্ঞানকোষ) এবং নেত্রকোনা জেলার সরকারি তথ্যসূত্রেও বিদ্যালয়টির প্রতিষ্ঠাবর্ষ ১৯০৫ বলে উল্লেখ রয়েছে।
বিদ্যালয়টির প্রতিষ্ঠাকালের পক্ষে গুরুত্বপূর্ণ প্রমাণ হিসেবে তুলে ধরা হচ্ছে ব্রিটিশ আমলে প্রকাশিত The Calcutta Gazette-এর বিভিন্ন সংখ্যা। বিদ্যালয় কর্তৃপক্ষের সংরক্ষিত তথ্য অনুযায়ী, ১৯২২, ১৯২৪, ১৯২৫, ১৯২৭ ও ১৯২৮ সালের গেজেটে তৎকালীন Teligati B.N.M.E. বিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের বৃত্তি লাভের তথ্য পাওয়া যায়। এসব নথি প্রতিষ্ঠানটির দীর্ঘদিনের শিক্ষা কার্যক্রমের ঐতিহাসিক সাক্ষ্য বহন করে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।
এ ছাড়া বিদ্যালয়ের শতবর্ষ উদযাপন উপলক্ষে প্রকাশিত স্মরণিকায় তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী বেগম খালেদা জিয়া, শিক্ষামন্ত্রী ড. ওসমান ফারুক এবং সাবেক স্বরাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী লুৎফুজ্জামান বাবরের শুভেচ্ছাবাণী প্রকাশিত হয়েছিল বলে বিদ্যালয়-সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা জানিয়েছেন। তাদের মতে, এসব ঐতিহাসিক উপাদান প্রতিষ্ঠানটির শতবর্ষী পরিচয়ের পক্ষে গুরুত্বপূর্ণ প্রাতিষ্ঠানিক দলিল।
তবে বিদ্যালয়টির কিছু সরকারি ও প্রাতিষ্ঠানিক নথিতে প্রতিষ্ঠার সাল ১৯৩৩ উল্লেখ রয়েছে। এ অসংগতি দূর করতে বিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ উদ্যোগ নিয়েছে। ২০২৬ সালের ২১ সেপ্টেম্বর বিদ্যালয় পরিচালনা কমিটির সভায় প্রতিষ্ঠাকাল ১৯৩৩ সালের পরিবর্তে ১৯০৫ সাল করার বিষয়ে সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। প্রতিষ্ঠার সাল সংশোধন এবং শতবর্ষী শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের তালিকায় অন্তর্ভুক্তির জন্য সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের কাছে আবেদনও করা হয়েছে।
বিদ্যালয়টির সহকারী প্রধান শিক্ষক ইলিয়াস উদ্দিন খান জানান, প্রতিষ্ঠানটির প্রতিষ্ঠাকাল ১৯০৫ সালের পক্ষে ঐতিহাসিক দলিল ও বিভিন্ন তথ্যসূত্র রয়েছে। এসব প্রমাণের ভিত্তিতে বিদ্যালয়টিকে শতবর্ষী শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের তালিকায় অন্তর্ভুক্ত করা হোক।
স্থানীয়দের ভাষ্য, প্রত্যন্ত অঞ্চলে অবস্থিত হলেও তেলিগাতী বৈদ্যনাথ হরেকৃষ্ণ একাডেমী দীর্ঘদিন ধরে শিক্ষার আলো ছড়িয়ে আসছে। প্রতিষ্ঠানটি একাধিকবার উপজেলা পর্যায়ে শ্রেষ্ঠ শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের স্বীকৃতি পেয়েছে বলেও সংশ্লিষ্টরা জানিয়েছেন। ভালো ফলাফল ও শিক্ষার পরিবেশ বজায় রাখার মধ্য দিয়ে বিদ্যালয়টি এলাকার শিক্ষাবিস্তারে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করছে।
স্থানীয় বাসিন্দাদের মতে, একটি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের শতবর্ষের ইতিহাস শুধু একটি প্রতিষ্ঠানের অর্জন নয়; এর সঙ্গে জড়িয়ে থাকে একটি অঞ্চলের শিক্ষা, সংস্কৃতি ও সামাজিক অগ্রগতির স্মৃতি। তাই প্রয়োজনীয় নথিপত্র যাচাই করে বিদ্যালয়টির ইতিহাসের যথাযথ মূল্যায়ন করা জরুরি।
শিক্ষক, শিক্ষার্থী, কর্মচারী ও এলাকাবাসীর প্রত্যাশা, সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ বিদ্যালয়টির উপস্থাপিত ঐতিহাসিক দলিল ও তথ্যসূত্র গুরুত্বের সঙ্গে পর্যালোচনা করবে। প্রতিষ্ঠাকাল-সংক্রান্ত অসংগতি নিরসন করে তেলিগাতী বৈদ্যনাথ হরেকৃষ্ণ একাডেমীকে শতবর্ষী শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের তালিকায় অন্তর্ভুক্ত করা হলে দীর্ঘদিনের ঐতিহ্য সংরক্ষণের পাশাপাশি প্রতিষ্ঠানটির সঙ্গে যুক্ত মানুষের প্রত্যাশাও পূরণ হবে।
এ বিষয়ে জানতে চাইলে মাউশি মহাপরিচালক অধ্যাপক ড. খান মইনুদ্দিন আল মাহমুদ সোহেল দ্য ডেইলি ক্যাম্পাসকে বলেন, ‘শতবর্ষী শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের তালিকা পাঠানোর পূর্বে উপজেলা শিক্ষা অফিস থেকে তথ্য সংগ্রহ করা হয়েছে। এরপরও যদি কোনো প্রতিষ্ঠান বাদ গিয়ে থাকে, তাহলে বিষয়টি নিয়ে আবেদন করতে হবে। আবেদন যাচাই-বাছাই শেষে শতবর্ষী প্রতিষ্ঠানের তালিকায় অন্তর্ভুক্ত করার উদ্যোগ নেওয়া হবে।’