পরিসংখ্যান স্পেশালিস্ট মোহাম্মদ রিয়াজুর রহমান শুক্রবার (৯ অক্টোবর) দ্য ডেইলি ক্যাম্পাসকে বলেন, ‘আমরা প্রাথমিক বিদ্যালয়ের তথ্য ব্যবহার করি না। আমাদের মোট শিক্ষার্থীর হিসাব প্রাথমিকোত্তর স্তরের। অর্থাৎ, মাধ্যমিক থেকে উচ্চশিক্ষা পর্যন্ত শিক্ষার্থীদের তথ্য এতে অন্তর্ভুক্ত রয়েছে।’
তিনি আরও বলেন, ‘প্রাথমিক শিক্ষার তথ্য প্রাথমিক শিক্ষা অধিদপ্তর থেকে সংগ্রহ করে প্রতিবেদনে যুক্ত করা হয়। তবে প্রাথমিক স্তরের শিক্ষার্থীদের সংখ্যা প্রাথমিকোত্তর স্তরের মোট শিক্ষার্থীর হিসাবে যোগ করা হয় না। ফলে এক বছরে সাড়ে ৯ লাখ শিক্ষার্থী কমে যাওয়ার যে হিসাব দেওয়া হয়েছে, তা মাধ্যমিক থেকে উচ্চশিক্ষা স্তরের শিক্ষার্থীদের তথ্যের ভিত্তিতে করা হয়েছে।’
মাধ্যমিক বিদ্যালয় পর্যায়ে শিক্ষার্থীর সংখ্যা কমেছে সবচেয়ে বেশি। শিক্ষা পরিসংখ্যানে-২০২৫ এর তথ্য মতে, মাধ্যমিক বিদ্যালয় শিক্ষার্থীসংখ্যা রয়েছে ৭৪ লাখ ৩৯ হাজার ৩৯ জন। এর আগে ২০২৪ সালের সংখ্যা ছিল ৭৮ লাখ ৪৭ হাজার ৫৪৬ জন। ফলে ৪ লাখ ৮ হাজার ৫০৭ জন কমেছে এবার। অর্থাৎ, মোট শিক্ষার্থীর অর্ধেকই কমেছে মাধ্যমিক পর্যায়ে।
ব্যানবেইসের সর্বশেষ শিক্ষা পরিসংখ্যানের তথ্য মতে, দেশে মাধ্যমিক থেকে বিশ্ববিদ্যালয় পর্যায় পর্যন্ত ৮৩ হাজার ৪৬২ শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে ১ কোটি ৮৭ লাখ ৩১ হাজার ১১২ শিক্ষার্থী এবং ৬ লাখ ৯১ হাজার ২২৬ জন শিক্ষক আছেন।
ব্যানবেইসের আগের বছর অর্থাৎ, ২০২৪ সালের শিক্ষা পরিসংখ্যানে দেখা যায়, দেশে মাধ্যমিক থেকে বিশ্ববিদ্যালয় পর্যায় পর্যন্ত ৮২ হাজার ৮৯টি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে ১ কোটি ৯৬ লাখ ৭৩ হাজার ৫৯১ শিক্ষার্থী এবং ৬ লাখ ৬৭ হাজার ৯৯ জন শিক্ষক আছেন।
এক বছর পর শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ও শিক্ষকের সংখ্যা বাড়লেও মোট শিক্ষার্থী কমেছে ৯ লাখ ৪২ হাজার ৪৭৯ জন।
শিক্ষা পরিসংখ্যানে-২০২৫ এর তথ্য মতে, মাধ্যমিক বিদ্যালয় শিক্ষার্থী সংখ্যা রয়েছে ৭৪ লাখ ৩৯ হাজার ৩৯ জন, ইংরেজি মাধ্যম স্কুলে ২৯ হাজার ৬৭৩ জন, স্কুল অ্যান্ড কলেজে ১৫ লাখ ৩১ হাজার ৪৩৪ জন, কলেজ পর্যায়ে ৪১ লাখ ৮৪ হাজার ৪৬৫ জন, মাদ্রাসায় ২৮ লাখ ৪০ হাজার ৯৭ জন, স্বতন্ত্র কারিগরিতে ৬ লাখ ৫০ হাজার ২৮ জন, পেশাগত শিক্ষায় ১ লাখ ৩২ হাজার ৩১৩ জন, টিচার এডুকেশনে ৩১ হাজার ৫৪৯ জন, বিশ্ববিদ্যালয়ে ১১ লাখ ১৩ হাজার ৯৮২ জন, সংযুক্ত কারিগরিতে ৩ লাখ ২৬ হাজার ৩২ জন, আপগ্রেড সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে ৭০ হাজার ৬৬৬ জন, ট্রেনিংয়ে ৩ লাখ ৮১ হাজার ৮৩৪ জন।
এবার মাধ্যমিক বিদ্যালয় পর্যায়ে শিক্ষার্থীর সংখ্যা কমেছে সবচেয়ে বেশি। শিক্ষা পরিসংখ্যানে-২০২৫ এর তথ্য মতে, মাধ্যমিক বিদ্যালয় শিক্ষার্থীসংখ্যা রয়েছে ৭৪ লাখ ৩৯ হাজার ৩৯ জন। এর আগে ২০২৪ সালের সংখ্যা ছিল ৭৮ লাখ ৪৭ হাজার ৫৪৬ জন। ফলে ৪ লাখ ৮ হাজার ৫০৭ জন কমেছে এবার। অর্থাৎ, মোট শিক্ষার্থীর অর্ধেকই কমেছে মাধ্যমিক পর্যায়ে।
শিক্ষার্থী কমে যাওয়ার যত কারণ
সাধারণ শিক্ষায় শিক্ষার্থী কমার পেছনে শিক্ষার মান নিয়ে অসন্তোষ, শিক্ষক নিয়োগ ও প্রশিক্ষণের দুর্বলতা এবং জবাবদিহির ঘাটতিকে বড় কারণ হিসেবে দেখছেন শিক্ষাবিদরা। সাধারণ শিক্ষার মানোন্নয়নে শিক্ষক নিয়োগ ও তাদের পেশাগত দক্ষতা উন্নয়নের ওপর জোর দেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের (ঢাবি) শিক্ষা ও গবেষণা ইনস্টিটিউটের অধ্যাপক মোহাম্মদ নূরে আলম সিদ্দিকী।
তিনি বলেন, শুধু বেতন-ভাতা বাড়ানো নয়, শিক্ষকদের চাকরির মেয়াদ, কর্মদক্ষতা মূল্যায়ন ও জবাবদিহির বিষয়গুলোও গুরুত্বপূর্ণ। বর্তমানে কোনো শিক্ষক একবার ব্যবস্থায় যুক্ত হলে তাঁর কর্মদক্ষতা খারাপ হলেও চাকরিতে থাকা নিয়ে কার্যকর জবাবদিহির ঘাটতি রয়েছে। এমপিওভুক্ত শিক্ষকদের ক্ষেত্রেও এ সমস্যা রয়েছে।
শিক্ষক নিয়োগের ক্ষেত্রে এনটিআরসিএর মাধ্যমে নিয়োগ চালু হওয়ায় দুর্নীতির সুযোগ কিছুটা কমলেও পুরো প্রক্রিয়া নিয়ে প্রশ্ন রয়েছে বলে মনে করেন তিনি। তার মতে, শ্রেণিকক্ষে পাঠদানের জন্য প্রয়োজনীয় দক্ষতা যাচাই এবং যথাযথ প্রশিক্ষণ নিশ্চিত না করেই অনেক শিক্ষককে নিয়োগ দেওয়া হয়। অথচ শিক্ষকতা এমন একটি পেশা, যেখানে দায়িত্ব পালনের আগে প্রয়োজনীয় প্রশিক্ষণ ও দক্ষতা যাচাই জরুরি। এ ক্ষেত্রে শিক্ষকদের জন্য নির্দিষ্ট মেয়াদে কার্যকর লাইসেন্স চালু এবং নির্দিষ্ট সময় পর তা নবায়নের ব্যবস্থার পক্ষে মত দেন তিনি।
শিক্ষক প্রশিক্ষণের ব্যবস্থাতেও বড় ধরনের দুর্বলতা রয়েছে বলে উল্লেখ করেন এই অধ্যাপক। তার ভাষ্য, এত বড় দেশে সরকারি শিক্ষক প্রশিক্ষণ কলেজ মাত্র ১৪টি। এসব প্রতিষ্ঠানে শিক্ষক প্রশিক্ষণের মূল কাজের তুলনায় অন্যান্য একাডেমিক কার্যক্রম বেশি গুরুত্ব পাচ্ছে। পাশাপাশি বেসরকারি শিক্ষক প্রশিক্ষণ কলেজগুলোর মান নিয়েও প্রশ্ন রয়েছে। তাঁর অভিযোগ, কিছু প্রতিষ্ঠানে প্রশিক্ষণের মান নিশ্চিত না করেই সনদ দেওয়া হচ্ছে।
শিক্ষকদের পেশাগত উন্নয়ন ও জবাবদিহির ঘাটতিকে সাধারণ শিক্ষার আরেকটি সংকট হিসেবে দেখছেন তিনি। তার মতে, সরকারি ও এমপিওভুক্ত প্রতিষ্ঠানে কর্মদক্ষতা দুর্বল হলেও চাকরি হারানোর আশঙ্কা তুলনামূলক কম থাকায় অনেক ক্ষেত্রে শিক্ষকদের দক্ষতা উন্নয়নের তাগিদ তৈরি হয় না। বিপরীতে, কিছু বেসরকারি প্রতিষ্ঠানে চাকরি টিকিয়ে রাখতে শিক্ষকদের নিজেদের দক্ষতা বাড়ানোর চাপ থাকে। তবে বড় কিছু স্কুলের বাইরে এ ধরনের জবাবদিহির ব্যবস্থা খুব বেশি কার্যকর নয় বলে মনে করেন তিনি।
অধ্যাপক নূরে আলম সিদ্দিকীর মতে, শিক্ষক নিয়োগ, প্রশিক্ষণ, প্রশিক্ষকদের যোগ্যতা, শিক্ষার মান এবং শিক্ষকদের জবাবদিহি এসব ক্ষেত্রে কাঠামোগত দুর্বলতা দূর না করলে সাধারণ শিক্ষার মানোন্নয়ন কঠিন হবে। আর শিক্ষার মান নিয়ে পরিবারগুলোর আস্থা তৈরি না হলে সামনের বছরগুলোতে শিক্ষার্থী সংখ্যা আরও কমবে বলে আশঙ্কা করেন তিনি।
সাম্প্রতিক বছরগুলোতে ইংরেজি মাধ্যম শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে শিক্ষার্থী সংখ্যা বাড়ছে বলেও ব্যানবেইসের তথ্য বলছে।
এ বিষয়ে এই শিক্ষক বলেন, যেসব পরিবারের আর্থিক সামর্থ্য রয়েছে, তাদের একটি অংশ সন্তানদের ইংরেজি মাধ্যমে পড়াচ্ছে। অন্যদিকে, দরিদ্র পরিবারের একাংশ মাদ্রাসামুখী হচ্ছে। ফলে সাধারণ শিক্ষার ওপর চাপ তৈরি হচ্ছে। ইংরেজি মাধ্যমে পড়াশোনার ক্ষেত্রে কিছু বাস্তব সুবিধাও রয়েছে। এ মাধ্যমে পড়লে শিক্ষার্থীদের ইংরেজি ভাষায় দক্ষতা ও বাইরের বিশ্বের সঙ্গে পরিচিত হওয়ার সুযোগ বাড়ে। এতে উচ্চশিক্ষা ও চাকরির ক্ষেত্রে তারা কিছুটা এগিয়ে থাকতে পারে। তবে ইংরেজি মাধ্যম মানেই বেশি সুযোগ এমন ধারণার পেছনে অতিরঞ্জিত প্রত্যাশাও কাজ করে বলে মনে করেন তিনি।
তিনি বলেন, শিক্ষার সার্বিক উন্নোয়নে কাজ করতে হবে। তা না হলে সামর্থ্য অনুযায়ী বিকল্প শিক্ষাধারার দিকে ঝোঁকার প্রবণতা আরও বাড়তে পারে।